ভারতে প্রতিটি মানুষের নিজস্ব লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ করার এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে । ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৪ সালে National Legal Services Authority বনাম Union of India মামলায় রায় দিয়ে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের স্ব-পরিচয়ের অধিকার স্বীকার করে । এরপর ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) অ্যাক্ট, ২০১৯ এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) রুলস, ২০২২, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, লিঙ্গ নির্ধারণের অধিকারকে কার্যকর ক’রে তোলে । ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) অ্যাক্ট, ২০১৯ আইনে সার্টিফিকেট অব আইডেন্টিটি প্রদানের বিধি রয়েছে ।
পশ্চিমবঙ্গ ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) রুলস, ২০২২ নিয়মে পশ্চিমবঙ্গে সার্টিফিকেট অব আইডেন্টিটি প্রাপ্তির আইনি প্রক্রিয়া বলা হয়েছে ।
আইনি প্রক্রিয়া
ধাপ ১: আইডেন্টিটি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন
একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (DM) কাছে ট্রান্সজেন্ডার আইডেন্টিটি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করতে পারেন । এই সার্টিফিকেট পাওয়ার পর, যদি আবেদনকারী লিঙ্গ পরিবর্তন সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার (Gender Affirming Surgery) করিয়ে পুরুষ বা মহিলা হিসেবে স্বীকৃতি চান, তাহলে তাঁকে সংশোধিত সার্টিফিকেট অব আইডেন্টিটির জন্য আবেদন করতে হবে ।
ধাপ ২: নাম পরিবর্তন (প্রয়োজনে)
যদি আবেদনকারী নতুন নাম নিতে চান, তাহলে তাঁকে একটি হলফনামা (affidavit) করতে হবে যেখানে পুরনো নাম, নতুন নাম, পরিবর্তনের কারণ এবং ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ থাকবে। এরপর পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি স্থানীয় ও জাতীয় দুটি সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে হবে। সবশেষে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গেজেটে নাম পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
ধাপ ৩: সরকারি নথি আপডেট করা
আইডেন্টিটি সার্টিফিকেট এবং গেজেট বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার পর, আবেদনকারী তাঁর নাম ও লিঙ্গ নিম্নলিখিত সমস্ত সরকারি নথিতে আপডেট করতে পারেন:
- আধার কার্ড
- পাসপোর্ট
- ভোটার আইডি
- ড্রাইভিং লাইসেন্স
- শিক্ষাগত সনদপত্র
- ব্যাংক ও চাকরির রেকর্ড
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় প্রক্রিয়ার কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা ট্রান্সজেন্ডার ওয়েলফেয়ার সেলের বা কোন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত ।
- আইডেন্টিটি সার্টিফিকেটের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তনের অস্ত্রোপচার বাধ্যতামূলক নয়, তবে পুরুষ বা মহিলা হিসেবে সংশোধিত সার্টিফিকেটের জন্য সেটা প্রয়োজন ।
- নাম পরিবর্তনের জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলেও, লিঙ্গ স্বীকৃতির জন্য তা প্রযোজ্য নয় ।
- পুরনো শিক্ষাগত সনদপত্র বা চাকরির রেকর্ড আপডেট করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী আলাদা আবেদন করতে হতে পারে ।
- গেজেট বিজ্ঞপ্তি, বিজ্ঞাপন এবং আইনি পরিষেবার জন্য সামান্য খরচ হতে পারে।
আমাদের দেশে নিজস্ব লিঙ্গ নির্ধারণের অধিকার নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে গেলে আগে বাড়িতে এবং সমাজে বহু প্রতিবন্ধকতা পেরোতে হয় । তারপরে আসে আইনি প্রক্রিয়া, যা খুব একটা জটিল না হ’লেও কিঞ্চিৎ খরচ এবং সময়সাপেক্ষ । তাই ধৈর্য ধ’রে, সবদিক বিবেচনা করে এগোতে হবে, কারণ নিজের সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে নিজেকেই…